Posted by : Rajesh Thursday, November 26, 2015


প্রথম মহাযুদ্ধের পরপরই শুরু হয় বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু এই শৃঙ্গ জয়ের প্রতিযোগিতা। শুরুর দিকে ভারত ও তিব্বত সরকার এভারেস্টে আরোহণ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিল। পরবর্তীতে ব্রিটিশ সরকারের মধ্যস্থতায় দুই দেশের সরকারই এভারেস্টে আরোহণের বিষয়ে একমত হয়। সকল প্রতিকূলতা শেষে রয়েল জিওগ্রাফিক সোসাইটির অর্থায়নে গঠিত এভারেস্ট কমিটির অধীনে ১৯২১ সালে কর্নেল সিকে হাওয়ার্ড বেরী প্রথম অভিযান শুরু করেন। দলে ছিলেন জর্জ ম্যালোরি এবং অন্যান্যরা। মুলত এটা ছিল এভারেস্টের ম্যাপিং আর রেকি অভিযান। দীর্ঘ ৫ মাস ধরে এভারেস্টে ওঠার সম্ভাব্য পথ খুঁজতে থাকেন তারা। এই দলের দুঃসাহসী এক সদস্য ম্যালরি তার অপর দুই সঙ্গীকে নিয়ে ৭,১০৪ মিটার (১৯,১০০ ফুট) উঁচুতে এভারেস্টের শীর্ষ চূড়ায় যাওয়ার একটি নিরাপদ রাস্তা খুঁজে পান। কিন্তু চূড়ায় ওঠার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।

এর পরের বছর ১৯২২ সালে দলনায়ক জেনারেল ব্রুস এর অধীনে আবার নতুন করে অভিযানে নামেন ম্যালরিরা। এভারেস্টের ইতিহাসে এটাই প্রথম পূর্ণাঙ্গ অভিযান। আগেরবারের ঠিক করা পথে ম্যালোরির দল ২৬,৮০০ ফুট পর্যন্ত উঠে যান। অন্য পর্বতারোহী জেফ্রি ব্রুস আর জর্জ ফিঞ্চ ইতিহাসে প্রথমবারের মত অক্সিজেন সিলিন্ডার ব্যবহার করেন, তারা ২৭,৩০০ ফুট পর্যন্ত ওঠেন এবং ইতিহাসের প্রথম হাই ক্যাম্প স্থাপন করেন। তাদের সাথে যোগ দেয় আরও ১৩ জন ইংরেজ পর্বত আরোহী ও ৬০ জন শেরপা। কিন্তু হঠাৎই ৬ জুন রাতে সংঘঠিত এক তুষার ঝড়ে ৭ জন শেরপা হারিয়ে যায়। তাদের মধ্যে থেকে ৩ জনকে মৃত অবস্থায় খুঁজে পাওয়া যায়। এভারেস্ট ইতিহাসে প্রথম মারা যাওয়ার ঘটনা এটাই। এবারের অভিযানটিও ব্যর্থ হয়।

১৯২৪: আবার শুরু হল অভিযান
১৯২৪ সালে আবার নতুন করে শুরু হয় এভারেস্ট জয়ের অভিযান। এবারও দলনায়ক ছিলেন জেনারেল ব্রুস। দার্জিলিং যাওয়ার পর জেনারেল ব্রুস ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে দল থেকে বাদ পড়েন। তখন ম্যালোরিকে দলনায়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়। দলে ছিলেন আগেরবার অক্সিজেন ব্যাবহারের যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত দেয়া জেফ্রি ব্রুস, হাওয়ার্ড সামারভেল, জর্জ নোয়েল। নতুন মুখ আলোচিত আরভিন এবং আরভিনের বন্ধু মাউন্টেনিয়ার নোয়েলও’ডেল।

১৯২৪ সালের ৮ জুন ম্যালোরিরা ২৬,৯০০ ফুট উঁচুতে ৬নং ক্যাম্পে অবস্থান করছিলেন। সেদিন অক্সিজেন সিলিন্ডার ও ক্যামেরা সাথে নিয়ে এভারেস্ট জয়ের জন্য বের হন ম্যালোরি ও অরভিন। ৮ জুন দুপুর ১২ টার পর তাদের আর দেখা যায়নি। তাদের কাছে পর্যাপ্ত অক্সিজেন ছিল। দুজনেই সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী সুস্থ ছিলেন। সামিটে ব্যার্থ হবার সম্ভবনা খুব কমছিল।আরভিন-ম্যালোরির রহস্যময় অন্তর্ধানের মধ্য দিয়ে ৩য় এভারেস্ট অভিযান ব্যর্থ হয়।

অবশেষে এভারেস্টে পদার্পণ
এরপর এক দশক এভারেস্ট অভিযান বন্ধ ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৭ সালে ৪র্থ অভিযান শুরু করেন কানাডীয় একটি দল। এরপর ১৯৫০ সালে আমেরিকান ও ব্রিটিশরা যৌথভাবে শুরু করেন এভারেস্ট অভিযান। ১৯৫১ সালে এরিক শিপ্টন নতুন এক পথ আবিষ্কার করে নামেন এভারেস্ট জয়ে। কিন্তু এবারও ব্যর্থ হয় অভিযান। অবশেষে ১৯৫৩ সালে এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। তাদের সাথে যোগ দেন আরেকদল অভিযাত্রী। তাদের মধ্যে ছিলেন কর্ণেল জনহান্ট, এডমন্ড হিলারী, নেপালী তেনজিং নোরগে সহ আরও অনেকে। ১৯৫৩ সালের ২৯ মে সকাল ১১ টায় নিউজিল্যান্ডের এডমন্ড হিলারী তার ২য় প্রচেষ্টায় এবং নেপালের শেরপা তেনজিং নোরগে তার ৭ম প্রচেষ্টায় ইতিহাসে প্রথমবারের মত এভারেস্ট জয় করেন এবং স্বাভাবিকভাবে ফিরে আসেন।

তেনজিং-হিলারী জুটিই কি প্রথম এভারেস্ট জয় করেছেন?
সবাই জানেন হিলারী-তেনজিং জুটি সর্বপ্রথম এভারেস্ট এর চূড়ায় আরোহন করেন। ধারণা করা হয় হিলারী এবং তেনজিং এর আগে হয়ত এভারেস্ট চূড়ায় পা রাখেন অরভিন-ম্যালোরি জুটি। ১৯২৪ সালে অরভিন-ম্যালোরি প্রথম এভারেস্ট জয় করেন। কিন্তু সেই সাফল্য দাবি করার জন্যে জীবিত ফিরতে পারেন নি দু'জনের কেউই।

১৯৯৮ সালে একদল অভিযাত্রী মৃত অরভিনের লাশ খুঁজে পায় প্রায় অক্ষত অবস্থায়। তার পরনে ছিল সাতটি কাপড়। আশ্চর্যের ব্যাপার হল, অরভিনের দেহে তেমন কোন ক্ষত চিহ্নছিল না। প্রচন্ড ঠান্ডায় প্রায় অবিকৃত ছিল তার দেহ। তবে কিভাবে তারা হারিয়ে গিয়েছিলেন? এর সঠিক উত্তর অরভিনের হারানো ক্যামেরাই দিতে পারবে। তবে সেটা উদ্ধার করা যায় নি।

মারা যাওয়ার ৭৫ বছর পর ম্যালোরির মৃতদেহ সমতলে ফিরিয়ে আনা হয়। ম্যালোরির কোমড়ে ক্ষতের চিহ্ন পাওয়া যায়। তা থেকে ধারণা করা হয় অরভিনের সাথে দড়ি বেঁধে উপরে ওঠার সময় এই ক্ষত হয় এবং ২য় ধাপ বা ১ম ধাপ থেকে পরে গিয়ে তারা মারা যান। 


মাউন্ট এভারেস্টে মৃত্যুর মিছিল:
এ পর্যন্ত ২৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে এভারেস্ট জয় করতে গিয়ে। এভালাঞ্চ বা তুষারধ্বস, পাথরস্রোত, তুষারঝড়, উচ্চতাজনিত অসুস্থতা, হিমাংকের নিচের তাপমাত্রা, ক্লান্তি এসবই মৃত্যুর প্রধান কারণ। এই সবগুলো পরিস্থিতির সম্মিলনে এক ভয়াবহ অবস্থা তৈরি হয়। বিশেষ করে ২৬ হাজার ফুটের ওপরের উচ্চতার এলাকা ডেথ জোন হিসেবে পরিচিত। সেখান থেকে মৃত্যদেহ নিচে নামিয়ে আনা কেবল কষ্টসাধ্যই নয় অত্যন্ত বিপদজনক। অধিকাংশ মৃতদেহ সেখানেই থেকে যায়। প্রচন্ড ঠান্ডায় তুষারের ভেতর মৃতদেহগুলো প্রায় অবিকৃত থাকে। পর্বতারোহীদের জন্য এগুলো অনেকটা পথনির্দেশকের মত কাজ করে।

এভারেস্টের ইতিহাসে ভায়বহ দিনটি আসে ১৯৯৬ সালের মে মাসে। একদিনেই আটজন পর্বতারোহী মারা যায়। এ মৃত্যুর মিছিল অব্যাহত আছে, গত বছর মারা গিয়েছে ১০ জন আর এ বছর মারা গিয়েছে ৮ জন। কিন্তু পর্বতারোহীরা দমতে রাজি নন। পৃথিবীর উচ্চতমশৃঙ্গটি জয় করতে হাজার হাজার ডলার খরচ করে জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছেন।

মাউন্ট এভারেস্ট জয় আগের তুলনায় কিছুটা সহজ হলেও, এখনো এভারেস্ট অভিযান অত্যন্ত কঠিন ও বিপদসংকুল। প্রতিকূল আবহাওয়া ও অসাবধানতাবশত মারা যান অনেকে। মাউন্ট এভারেস্ট জয়ের একেবারে শুরুর দিকে একসাথে ৭ জন শেরপা মারা গিয়েছিলেন। এছাড়া প্রথম এভারেস্ট জয় করতে গিয়ে আরভিন-ম্যালোরিও মারা গিয়েছেন। এভাবে প্রতি বছরই কেউ না কেউ মারা যায়। এই তালিকায় বাংলাদেশও রয়েছে। ২০১৩ সালের ২১ মে এভারেস্ট জয় করে নিচে নেমে আসার সময় দূর্ঘটানায় নিহত হন বাংলাদেশী পর্বতারোহী মোহাম্মদ খালেদ হোসেন। 

{ 1 comments... read them below or add one }

  1. অজানাকে জানা এবং অজেয়কে জয় করার দুর্নিবার ইচ্ছা থেকেই মানুষ এভারেস্ট জয় করার স্বপ্ন দেখতে পারে, মাউন্ট এভারেস্ট জয়ী সবাইকে বিশেষ করে প্রথম দুজন মানুষ- হিলারি এবং তেনজিংকে অফুরন্ত শুভেচ্ছা জনাই।

    ReplyDelete

- Copyright © Travel With Me - Skyblue - Powered by Blogger - Designed by Johanes Djogan -