- Back to Home »
- মিশন সাকাহাফং
Posted by : Rajesh
Tuesday, November 24, 2015
রোজ রোজ গৎবাঁধা রুটিনের বলয়ে থেকে যখন নাভিশ্বাস উঠে যায় তখনই মন চায় ছুটে যেতে পাহাড়ের ধারে, দিগন্তের কাছে। বান্দরবান। বাংলাদেশের অন্যতম নৈস্বরগিক দৃশ্যের লীলাভূমি।প্রকৃতি তার আপন হস্তে বান্দরবানকে গড়ে তুলেছে, সাজিয়েছে আপন মহিমায়। অলঙ্কা
র যেমন একজন রমনীর শ্রী বৃদ্ধি করে ঠিক তেমনি বান্দরবান যেন আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির অলঙ্কার এবং অহঙ্কার। এ জেলাতেই রয়েছে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্বত শৃঙ্গ – সাকা হাফং। এটিই একমাত্র জেলা যেখানে দুটি নদী, সাঙ্গু ও মাতামূহুরি, দক্ষিণ থেকে উত্তর দিকে বয়ে চলে। সবুজ পাহাড়, ঘন অরন্য, পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে চলা নদী আর ঝর্ণার অপূর্ব সমাবেশ যেন এ জেলাটিকে করে তুলেছে এক স্বর্গপুরী।
৯ নভেম্বর ২০১১। সাকা হাফং জয়ের উদ্দেশ্যে আমরা আটজন (আমি, মহসিন, প্রিন্স, কাদের,
সাব্বির, ফয়সাল, হেভেন ও তারেক) ঢাকা থেকে রাতের
বাসে রওনা দিয়ে সকালে বান্দরবান শহরে পৌঁছাই। সেখান
থেকে রুমা বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসে চড়ে ৩ ঘণ্টা পর পৌঁছাই
কৈক্ষংছড়ি। রুমা বাসস্ট্যান্ড থেকে কৈক্ষংছড়ি পর্যন্ত সমগ্র
পথটি এক কথায় অসাধারন। অভিজ্ঞ ড্রাইভারের দক্ষ চালনায়
আমরা পাহাড়ি উঁচু-নিচু পথ দিয়ে ছুটে চলেছি এবং উপভোগ
করেছি পাহাড় ও দিগন্তের মিতালি দৃশ্য।
কৈক্ষংছড়ি থেকে নৌকায় চড়ে সাঙ্গু নদীর বুক
চিড়ে আমরা ছুটে চলেছি রুমা বাজারের উদ্দেশ্যে। পাহাড়ের
বাঁকে বাঁকে বয়ে চলা নদীর নয়নাভিরাম দৃশ্য
দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম রুমা বাজার।
সেখানে আমাদের পূর্ব পরিচিত গাইড
বাসিমং আমাদেরকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য উপস্থিত ছিলেন।
রুমা বাজার গাইড সমিতির আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন
করে সেদিনকার মত আমরা একটা হোটেলে রাত কাটালাম।
১০ নভেম্বর। সকাল বেলায় আর্মি ক্যাম্প থেকে তাজিংডং যাওয়ার
অনুমতি নিলাম কেননা সাকা হাফং যাওয়ার জন্য তারা সাধারণত
অনুমতি দেয়না। বড় কিছু অর্জনের জন্য একটু
রিস্কতো নিতেই হবে। আগামি ছয় দিনের রান্নার জন্য
আমরা শুধুমাত্র মসলা, লবণ ও ডাল কিনে নিলাম
এবং সঙ্গে শুকনো খাবার হিসেবে কেক ও বিস্কুটও কিনলাম
কারন পরদিন হতেই আমরা সভ্য দুনিয়া হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ব।
অত্যন্ত দুর্গম অঞ্চল বলে খাওয়ার সমস্যা প্রকট।
আমাদের হন্টন অভিযান মূলত এখান থেকেই শুরু। আধ ঘণ্টার মত
পাহাড় বেয়ে উঠতে হল। তারপর সোজা নিচে ঝিরি পথ। ঝিরি পথ
দিয়ে হাটার অভিজ্ঞতা লিখে প্রকাশ করা অসম্ভব। গহীন নির্জন
পাহাড়ি অরণ্যের মাঝ দিয়ে বয়ে চলা ঝিরির কলতান, পাখির গুঞ্জন,
অদ্ভূত পোকা-মাকড়ের ডাক, হাজার ফুট উঁচু পাহাড়
থেকে নেমে আসা লতা-পাতা ও ঝিরির বুকে বিভিন্ন আকারের
পাথরের চাঁঈ। ঝিরি পথের শেষ আর গিরি পথের যেখানে শুরু
সেখানে আমরা ‘চিপাছড়া’ নামে একটি ঝর্ণার দেখা পেলাম।
সেই ঝর্ণার হিমশীতল পানিতে একটু ঝুঁকি নিয়ে গোসলও
করলাম। এবার গিরিপথ বেয়ে আবার উঠা। এই বিপজ্জনক গিরিপথ
দিয়ে খুব
সাবধানে পা ফেলে আমাদেরকে যেতে হয়েছে।
সর্বশেষ পাহাড়ের চূড়ায় অপূর্ব সুন্দর একটি লেক পাহাড়ের
সারির মধ্যখানে বিস্তৃত।
লেকটির নাম ‘বগালেক’। ভাবা যায়! সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায়
১২০০ ফুট উঁচুতে চারদিক পাহাড় ঘেরা একটি লেক। বগালেক
সম্পর্কে প্রচলিত একটি ধারনা হচ্ছে বছরের এপ্রিল-
মে মাসে এই লেকের পানি লালচে ঘোলাটে হয়ে যায়।
স্থানীয় ধারণা মতে কোন আগ্নেয়গিরির সংযোগ
থাকতে পারে। বগালেক পাড়াতে বম আদিবাসীদের বসবাস।
আমরা তাদেরই একটি কটেজ ভাড়া নিয়ে থাকলাম। সেইদিন
সৌভাগ্যবশত ছিল শুক্লাচতুর্দশী। পূর্ণিমার আলোয়
রহস্যঘেরা লেকটিকে দেখে বারবারই রোমাঞ্চিত হচ্ছিলাম।মুরগির বারবিকিউ
দিয়ে রাতের ভোজন শেষ করলাম। বগালেকে রাত্রি যাপন ছিল আমাদের এই অভিযানের
অসাধারণ অংশ।
১১ নভেম্বর। সকালবেলায় হাঁটা শুরু করলাম কেওক্রাডাং-এর
উদ্দেশ্যে। আমাদের মধ্যে পাঁচজন
আগে কখনো কেওক্রাডাং যায়নি। তাই সাকা হাফং-এর রুট
থানচি দিয়ে না করে এই পথে ঠিক করেছিলাম।
কেওক্রাডাং যাওয়ার পথে পেলাম চিংড়ি ঝর্ণা।
বাংলাদেশে যতগুলো সুন্দর ঝর্ণা আছে তার মধ্যে এটি একটি।
ঝর্ণা পার হয়ে আবার হাঁটা শুরু করলাম। ধৈর্য্যের অসীম পরিচয়
দিয়ে আরও দুই ঘণ্টা হেঁটে পৌঁছুলাম দার্জিলিং পাড়ায়। এখানেও বম
আদিবাসীদের বসবাস। দার্জিলিং পাড়ায় আমাদের পুরনো বন্ধু
রবার্টের সাথে দেখা করে আবার হাঁটা শুরু। রবার্টের
সহযোগিতায় এবার আমাদের সাথে যুক্ত হলেন সম নামের আরওএখানে উল্লেখ্য,
বাসিমং আমাদের সম্পূর্ণ অভিযানের সঙ্গী। কিন্তু সমদা হলেন
একটি নির্দিষ্ট পাড়া পর্যন্ত।
আরও আধঘণ্টা ওঠার পর কেওক্রাডাং পৌঁছালাম। কেওক্রাডাং-এ
উঠে মনে হচ্ছিল যেন বান্দরবানের ছাদে উঠেছি।
চারিদিকে সারি সারি পাহাড় আর সবুজের সমারোহ। সমুদ্রের
নিকটে নিজেকে তুচ্ছ মনে হয় আর কেওক্রাডাং-এর চূড়ায়
নিজেকে পর্বত দেবতা মনে হচ্ছিল। তিন ঘণ্টার ট্রেকিং এর
ক্লান্তি কর্পূরের মত উবে গেল কেওক্রাডাং জয় করে।
প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে বিমুগ্ধ হয়ে ভাবছিলাম জীবন্ কেন
কচ্ছপের মত দীর্ঘতর হলোনা!
কেওক্রাডাং প্রস্থান করার পর আমরা মোটামুটি সভ্য জগৎ
থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম। এরপরের পাঁচদিন আমাদের
জন্য অপেক্ষা করছিল এক কঠিন সংগ্রামময় মূহুর্ত। সকাল
থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আমাদের খাবার ছিল কেক, বিস্কুট,
স্যালাইন আর গ্লুকোজ। স্যালাইন আর গ্লুকোজই ছিল
আমাদের সারাদিনের চালিকাশক্তি। প্রত্যেকের হাতে ছিল লাঠি,
কেননা লাঠি ট্রেকিং-এর কষ্ট অনেকটা লাঘব করে। কাঁধে ছিল
প্রায় চার কেজি ওজনের ব্যাগ। এ কারনে বিস্কুট, স্যালাইন, ফাস্ট এইডের জিনিস পত্র সব হিসাব করে নিতে হয়ে ছিল
কেওক্রাডাং-এর পরে পাসিং পাড়া পার হয়ে সন্ধ্যের অনেক
আগেই আমাদের ঐদিনের গন্তব্যস্থল থাইকিয়াং পাড়ায়
পৌঁছে গেলাম। পাসিং পাড়া এবং থাইকিয়াং পাড়া – দুটিতেই বম আদিবাসিদের
বসবাস। পাড়ায় একজন মধ্য বযষ্ক শিকারী রামথন দা’র
সহযোগিতায় পাড়া কমিটির অনুমতি সাপেক্ষে ট্যুরিস্টদের জন্য
নির্ধারিত একটি ঘরে থাকলাম। আমাদের
বাসিমং তড়িঘড়ি করে খিচুড়ী রাঁধতে বসে পড়ল। পাড়ার
মাঝখানে বিশাল উঠান। উঠানে শুয়োর ঘুরে বেরাচ্ছিল আর
অদ্ভুত সব আওয়াজ করছিল। শুয়োরের সাথে বসবাস! এক
অন্যরকম অভিজ্ঞতা। বগালেক ছাড়ার পর থাইকিয়াং পাড়ায় এসে শুধু
একটাই অনুভূতি হচ্ছিল, আমরা ধীরে ধীরে দুর্গম
অঞ্চলে ঢুকে পড়ছি। দুর্গম বলছি এ কারণে যে, কাঠের
পাটাতনের উপর চাদর বিছিয়ে আঁটসাঁট হয়ে শুতে হয়েছে।
অবশ্য ওরা শীত নিবারণের জন্য কম্বল দিয়েছিল। হাত-মুখ
ধোয়া আর খাওয়ার জন্য আমাদের দশজনের জন্য বরাদ্দ ছিল
মাত্র দুই বোতল পানি। প্রাকৃতিক কাজ করার জন্য যে টয়লেট
ছিল তার নিচেই শুয়োর ঘুরাফেরা করছিল। কাজেই
বোঝা যাচ্ছে, যেই টয়লেটে গিয়েছে তার
একেবারে ত্রাহি মধূসুদন অবস্থা!
থাইকিয়াং পাড়ায় সেদিন রাতেত স্থানীয় একজন
বয়োজে্্যস্ঠকে নিয়ে আলোচনা করলাম। তিনি আমাদের ম্যাপ
দেখে কীভাবে পরের পাড়ায় যেতে হবে সে পরামর্শ
দিলেন। পরদিন সকালে আগের রাতের
রান্না করা খিচুড়ি খেয়ে আবার যাত্রা শুরু করলাম। উদ্দেশ্য তাকরাই
পাড়া।
১২ নভেম্বর। বাসিমং আর সমদার অভিজ্ঞ দিকনির্দেশনায় সকাল
থেকে দুপুর পর্যন্ত ক্রমাগত হাঁটলাম। হাঁটা বলতে পাহাড়ে ওঠা-
নামা আবার ওঠা-নামা। কিছুক্ষণ পরপর ঝিরি পাচ্ছিলাম যে কারণে পানির
কোন সমস্যা হয়নি। বাসিমং পথ
চলতে চলতে পাহাড়ি বরবটি কুড়িয়ে নিচ্ছিল
কেননা রাতে সেগুলো খেতে হবে। কারণ আমরা কোন
সবজি নিয়ে আসিনি। সকাল
থেকে ঘণ্টা তিনেক ভালোই যাচ্ছিলাম। পাহাড়ি পথ ছিল
বলে কোন অসুবিধা হচ্ছিলনা। কিন্তু একটা পাহাড় (যেটার নাম
জানা নেই) পড়ল যেটা ছিল আগের পাহাড় গুলোর
চেয়ে তুলনামূলক বেশি খাড়া। বহুদিন অব্যবহৃত থাকার ফলে পথ
হারিয়ে গিয়েছিল ঝোপঝাড়ে, জংলা লতাপাতায়। এই
পাহাড়টি উঠতে তিনটি সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলাম আমরা।
প্রথমত, তুলনামূলক খাড়া আর শিশিরে শিক্ত হয়ে পথ পিচ্ছিল
হয়ে ছিল। দ্বিতীয়ত, ঝোপঝাড় কেটে কেটে পথ
তৈরী করে যেতে হচ্ছিল। তৃতীয়ত, জোঁক। অভিযানে এই
প্রথম আমরা জোঁকের উপদ্রবের শিকার হলাম। একটু পরপরই
জোঁক ধরছিল আর টেনে টেনে ফেলে দিচ্ছিলাম। তখন
ভাবছিলাম, এ রক্তদান কিছুতেই বৃথা যেতে দিব না। পরক্ষণেই
ভাবছিলাম, সাকা হাফং! তা কী আদৌ জয় করতে পারব!
পাহাড়টা থেকে নামার পরেই গিয়ে পড়লাম রেমাক্রী খালে।
রেমাক্রী খাল জীবনে দেখা অনন্য সাধারণ
দৃশ্যের একটি। স্বচ্ছ সবুজ পানির প্রচন্ড স্রোত, পাথর আর
পাথরের চাঁঈ ভেঙে এগিয়ে চলছে আপন ঠিকানায়।
রেমাক্রী খালের দুপাশে ঘন বন। কোথাও কোন মানুষ
নেই। বনে কিছু গয়াল (বন্য গরু বিশেষ) দেখতে পেলাম।খাল
ধরে হাঁটতে হাঁটতে দুপুর নাগাদ একটা পাড়ায় এসে পৌঁছালাম। এর
নাম দুলাচরন পাড়া। এখানে মুড়ং বা ম্রো আদিবাসদের বসবাস।
মুড়ং আদিবাসিদের সম্পর্কে বইয়ে পড়েছিলাম।
বইয়ে পড়া জীবনযাত্রা বাস্তবে দেখতে পাব তা ভাবিনি। দুলাচরন
পাড়ায় যাত্রা বিরতির পর আবার সেই রেমাক্রী খাল
ধরে রওনা দিলাম পরবর্তী গন্তব্যস্থল তাকরাই পাড়া।
সুনশান নিরব নিভৃত অরন্যের মাঝখান
থেকে ভেসে আসা রেমাক্রী খালের ভয়ঙ্কর
স্রোতের শব্দ মনে একটা অজানা আতঙ্কের সৃষ্টি করছিল।
আতঙ্ক আরো বেড়েছিল যখন জানতে পারলাম যে সমদা পথ
ভুল করে ফেলেছেন। তারপরও তার
দিকনির্দেশানুযায়ী এগিয়ে চলছিলাম। কেননা ফেরার পথ নেই।
বিকাল গড়িয়ে প্রায় সন্ধ্যা। তখনও আমরা রেমাক্রী খালের
তীর ঘেষে চলছি। জঙ্গলে অন্ধকার ঝুপ
করে নেমে আসে। সবাই হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিয়েছিলাম।
এমনিতেই আসিবাসীদের পাড়াগুলো অনেক তফাতে থাকে।
তার উপর রেমাক্রী খালের এদিকে পাড়া নেই বললেই
চলে। সেই দুপুরে দুলাচরণ পাড়া ফেলে এসেছিলাম, তারপর
আর কোন পাড়ার দেখা নেই। কাজেই
সামনে এগোনো ছাড়া কোন গতি নেই।
ক্ষণে ক্ষণে আলোর অবস্থা দেখছিলাম আর হন্য
হয়ে ছুটছিলাম। ততক্ষণে সবাই ভীত সন্ত্রস্ত। তারপর
একটা সময় কিছু আদিবাসীদের দেখা পাওয়া গেল। ওরা বলল,
আপনারা ঠিক পথেই যাচ্ছেন, তাকরাই পাড়া আর একটু সামনে। তখন
ধড়ে যেন প্রাণ ফিরে এল। এ কথাটি বলার আরও একটি কারণ –
আমরা সবাই গয়ালের পায়ের ছাপ দেখেছি কিন্তু একটা পায়ের
ছাপ কোনভাবেই গয়ালের পায়ের ছাপ ছিলনা। কারণ ওটা একটা বড়
থাবার ছাপ ছিল। হতে পারে ভাল্লুক, আবার নাও হতে পারে।
ত্রিপুরা আদিবাসীদের নিয়ে তাকরাই পাড়াটি গড়ে উঠেছে।
এখানে সিমন ত্রিপুরা এবং রমেশ ত্রিপুরার সাথে পরিচয় হল।
তাদেরই একটা ঘরে জায়গা ভাগাভাগি করে রাতে থাকলাম।
রাতে আমাদের জন্য বাসিমং বরবটির ঝোল দিয়ে তরকারি, ডাল
আর ভাত রান্না করলেন।
১৩ নভেম্বর। কাকডাকা ভোরে ঘুম থেকে উঠে হাত-মুখ
না ধুয়েই সকালের নাস্তা। তারপর যাত্রা শুরু। আজ আমাদের সেই
কাঙ্খিত দিন। এই মাহেন্দ্র দিনের জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।
সবাই আসন্ন সাকা হাফং জয়ের উত্তেজনায় বিভোর।
আজকে আমাদের সফর সঙ্গী হয়েছেন সিমন ও রমেশ
ত্রিপুরা। সমদা ফিরে গেছেন তার গ্রামে।
আবার সেই রেমাক্রী খাল ধরে আমরা হাঁটা শুরু করলাম। বেশ
কয়েকটা ছোট-বড় ঝর্ণা পেলাম। সকালবেলায় খালের
হিমশীতল পানিতে অনিচ্ছা স্বত্তেও নামতে হয়েছিল।
একটা জায়গায় খাল অতিক্রম করার জন্য কোমর পর্যন্ত (কারও
কারও বুক) পানিতে নামতে হয়েছিল। দশটা নাগাদ নেপিউ পাড়ায়
গিয়ে পৌছালাম।এ পাড়ায় মুরংরা বসবাস করে। এখান
থেকে সাকা হাফং-এর চূড়া দেখে রোমাঞ্চ আরও
বেড়ে গিয়েছিল। ঘণ্টা দেড়েক এর মধ্যেই
আমরা সাকা হাফং-এর চূড়ায় পৌঁছে যাব। পাড়ার কারবারি (সর্দার) জানালেন
সাকা হাফং-এর পথটি এখন ঝোপ-ঝাড়ে পরিপূর্ণ।
ওখানে যেতে হলে স্থানীয়
একজনকে সাথে নিতে হবে। ‘ল্যাংড়ো’ নামে একজন
মুরং আমাদের সাথে যেতে রাজি হলেন। নেপিউ
পাড়াকে সাকা হাফং-এর বেস ক্যাম্প বলা যেতে পারে।
নেপিউ পাড়া পর্যন্ত আসতে বিগত কয়েকদিন
আমাদেরকে বিপজ্জনক কয়েকটি ঢালু পথ পাড়ি দিতে হয়েছিল।
কোথাও কোথাও পথ ছিল এক ফুট চওড়া আর এক-দেড় হাজার
ফুট নিচে ছিল খাদ। একটা ভুল পদক্ষেপে মৃত্যু ছিল অবধারিত।
অনেক পথ ছিল ঝুড়ি পাথরে আবৃত যেখানে পা পিছলে হাজার
ফুট নিচে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। এ সমস্ত কারণেই
আমাদের একজন বন্ধু – সাব্বির, চূড়ান্ত মূহুর্তে এসে সাকা হাফং-
এ যাওয়ার জন্য অপারগতা জানাল। অবশ্যই তাকে অভিনন্দন
জানাতে হবে যে এতটা পথ ধৈর্য, সাহস আর দক্ষতার
সাথে আসতে পেরেছে। আমরা কেউই তাকে জোর
করিনি কারণ যেহেতু ও নিজেই আর রিস্ক নিতে চাইছিলনা। যাই
হোক, নেপিউ পাড়ায় তাকে রেখে আমরা রওনা হলাম।
সত্যিকার অর্থে সাকা হাফং-এর পথটি ছিল অনেক
বেশি অ্যাডভেঞ্চারাস। সবার সামনে ল্যাংরোদা দা দিয়ে ঝোপ-
ঝাড় কেটে কেটে আমাদের জন্য পথ
তৈরী করে দিচ্ছিলেন। এমনিতেই খাড়া পাহাড় তার
উপরে ঝোপ-ঝাড়ের জন্য সামনের পথ দেখতে খুব
সমস্যা হচ্ছিল। জোঁকের উপদ্রবতো আছেই। কোথাও
কোথাও সূর্যের আলো কমে গিয়ে হালকা অন্ধকার
সৃষ্টি হয়েছিল। মনে হচ্ছিল আমাজান জঙ্গলে প্রবেশ
করেছি। এত নির্জন আর নৈঃশব্দিক পরিবেশ যে গা ছমছম
করে উঠে। হঠাৎ একটা চমৎকার ঝর্ণার দেখা পেলাম।
ঝর্ণাটি বেশ বড় ছিল। সময়ের অভাবে ঝর্ণার কাছে গেলাম না।
অভিযানের আদ্যোপান্ত সময়টাকে আমরা খুব হিসেব
করে ব্যবহার করেছি। যে জন্য ছবিও তুলেছি কম।
ঝর্ণা পেরিয়ে আরও কিছুক্ষণ হাঁটার পর সূর্যের আলোর
দেখা পেলাম। মনে হল যেন মাটি ভেদ করে বাইরের
জগৎটাকে দেখছি। তখন আমরা পাহাড়ের একটি উঁচু ঢালের উপর
দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ বাইরের জগৎটাকে উপভোগ করে আবার
ওঠা শুরু করলাম। একটি জায়গায় পথটা এরকম ছিল – ডানদিকে খাড়াঢাল
আর বামদিকে দেয়াল। ডানদিকের ঢালু জায়গাটায় একবার
পা ফসকে গেলে দেহের ভারে অথবা গতি জড়তার জন্যই
হোক;পিতৃ প্রদত্ত জানটা নিয়ে আর বাড়ি ফেরা হবে না। এজন্যই বোধহয়
সেনাবাহিনী এখানে আসার অনুমতি দেয়না। কিছু কিছু জায়গায় আধ
বসা হয়ে খুব ধীরে ধীরে উঠতে হচ্ছিল।
কেননা একজনের একটি ভুল পদক্ষেপের জন্য সবারই বিপদ
ঘনিয়ে আসতে পারে। অধিক সতর্কতার জন্য আমরা পরস্পর
থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখেছিলাম। আর কাউন্টিং ছিল
আমাদের সমস্ত অভিযানের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
প্রত্যেকেই তার অবস্থান থেকে কাউন্ট
করে উপস্থিতি জানান দিচ্ছিল।
তখন দুপুর বারোটা দশ। বিস্ময়ের ঘোর যেন কাটছিলনা।
অবশেষে সাকা হাফং-এর চূড়া পদপিষ্ট
করে সগর্বে চেঁচিয়ে উঠলাম, হুররে! আমরা পেরেছি!
সত্যিই, আমাদের মত অপ্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ট্রেকারদের জন্য
এটা ছিল এক অনবদ্য জয়। এক অসাধারণ অভিযান। সকলের সু-
শৃঙ্খল পদচারনা, সম্মিলিত প্রচেষ্টা, ঐক্য, ধৈর্য, সাহস, ত্যাগ, আর
জয়ের উন্মত্ত নেশার কারণেই এটা সম্ভব হয়েছে।
আমরা খুশিতে একে অপরকে জড়িয়ে ধরেছিলাম। আমার
চোখে প্রায় পানি এসে গিয়েছিল।
সাকা হাফং-এর মাঝখানে আমাদের জাতীয়
পতাকা দেখতে পায়ে আবেগ আরো ঘনীভূত হল। পতাকার
সামনে মাটিতে তিনটি পানির বোতল পেলাম, যেটার
মধ্যে রাখা কাগজে পূর্বসুরী অভিযাত্রীদের পরিচয়
লেখা ছিল। আমরা একটা মোটা লাঠির
মধ্যে ছুরি দিয়ে কেটে সবার নাম ও ফোন নাম্বার
লিখে গেঁথে দিলাম সাকা হাফং-এর চূড়ায়।
সাকা হাফং-এর চূড়া খুব বেশি চওড়া না। এর দক্ষিণ-পূর্ব
দিকে মিয়ানমার। মূলত, সাকা হাফং বাংলাদেশ এবং মিয়নামাররের
মধ্যে একটি সীমারেখা তৈরী করেছে। সাকা হাফং-এর চূড়াটিও
ঝোপ-ঝাড়ে আবৃত ছিল। আর যে দিকে দৃষ্টি দিই শুধু দিগন্ত
বিস্তৃত সবুজ পাহাড়ের সারি। নজরকাড়া দৃশ্যাবলী ও অজয়কে জয়
করার অনুভূতি এত দিনের সমস্ত পরিশ্রম, ক্লান্তি যেন
ধুয়ে মুছে দিল। উল্লেখ্য ২০০৬ সালে সাকা হাফং প্রথম জয় করেন ব্রিটিশ অভিযাত্রী জেনজি ফুলেন।
আমরা এক ঘণ্টার মত অবস্থান করে নেপিউ পাড়ায় ফিরে এলাম দুপুর নাগাদ। গিয়েই
সাব্বিরকে জড়িয়ে ধরে বিজয়ের অনভূতি জানালাম। সত্যিই, তার
জন্য আফসোস হয়েছিল। ও আমাদের অভিনন্দিত করল।
বিকাল নাগাদ একই পথে আমরা তাকরাই পাড়ায় ফিরে এলাম।
১৪ নভেম্বর।আজ আমাদের গন্তব্যস্থল শেরকর পাড়া। তাকরাই
পাড়া থেকে অন্য একজন গাইড আমাদেরকে থান্দুই
পাড়া পর্যন্ত পৌঁছে দিলেন। থান্দুই পাড়া পর্যন্ত আসতে দুই
ঘণ্টার মত লেগেছিল।
থান্দুইতে আমরা গাইডটিকে ছেড়ে দিলাম। কিছুক্ষণ
যাত্রাবিরতি নিয়ে আবার হঁটা শুরু করলাম।
থান্দুই থেকে শেরকর পাড়ায় যেতে আরও
একটি পাড়া পরেছিল। পাড়াটির নাম শিম্তলাম্পি।জিহবার ব্যায়ামের জন্য একেবারে যুতসুই একটা নাম।এরপরই ছিল তাজিংডং।
কেওক্রাডাং জয় হল, সাকা হাফং জয়ও হল, তাজিংডং-ই আর বাদ
থাকবে কেন! তাই তাজিংডং-এর চূড়ায়ও উঠে গেলাম। তাজিংডং-এর
তিনটি চূড়ার সবচেয়ে উঁচু চূড়াতেই উঠলাম। তিনটি চূড়া তাজিংডং-
কে বিশেষ সৌন্দর্য-মণ্ডিত করেছে। তবে তাজিংডং-এর চূড়ার
কাছাকাছি পথটাও বন্ধুর ছিল।
শেরকর পাড়ায় পৌঁছোতে বিকেল হয়ে গেল। এখন পর্যন্ত
দেখা সবচেয়ে সুন্দর পাড়া। এটিতেও বমরা থাকে। পাহাড়ের
উঁচুতে পাড়াটি অবস্থিত হওয়ায় যে কোন
জায়গা থেকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য চোখে পড়ে।
একজন বয়োজেস্ঠ ব্যক্তির ঘরে উঠলাম।
লোকটির আতিথেয়তা আমাদের মুগ্ধ করল। বৃদ্ধ লোকটির
দেহসৌষ্ঠব দেখেই বোঝা যায় পাহাড়িরা কত পরিশ্রমী।
পাহাড়িরা খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে নিত্যনৈমত্তিক ব্যস্ততায়
ডুব দেয়। তাদের কঠোর পরিশ্রম থেকে আমাদের অনেক
কিছু শেখার আছে।
শেরকর পাড়ার রাতটি চমৎকার কেটেছিল। সমস্ত পৃথিবী যখন
অন্ধকারে ডুবে গেল তখন আমরা কয়েকজন পাহাড়ের চূড়ার
কোন এক পাড়ার ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে নক্ষত্রমণ্ডিত আকাশ
দেখছিলাম। সেদিন জোছনা ছিল না। ক্ষণে ক্ষণে দেখছিলাম
উল্কার পতন আর আকাশগঙ্গা। দূর থেকে ভেসে আসছিল
একটি পাহাড়ি সঙ্গীতের সুর। ঘরের সাথে লাগোয়া বাঁশের
চটির তৈরী খোলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে নক্ষত্র আর পাহাড়ি সুরের
মুর্ছনা অনাবিল আনন্দে ভাসিয়ে দিয়েছিল আমাদের। আজ
রাতেও যথারীতি বরবটির ঝোলের সাথে জুম চালের ভাত
খেলাম। আসলে গত পাঁচদিনের এই মানবেতর
খাওয়াদাওয়া বা জীবন-যাপন সবকিছুই ট্রেকিং-এর আনন্দের
কাছে ম্লান হয়ে গিয়েছিল। রাত্রে কিছুক্ষণ তাস খেলে ঘুম।
১৫ নভেম্বর। আজ আমাদের সভ্য জগতে ফিরে যাওয়ার পালা।
তবে অসভ্য জগতেও ছিলাম না। মূলত সভ্য
বলতে বোঝাচ্ছি দোকান, যানবাহন, মোবাইল নেটওয়ার্ক
আছে এমন একটি জায়গা। তাজিংডং আসার আগ পর্যন্ত গত পাঁচদিন
ছিলাম নেটওয়ার্কের বাইরে। নেটওয়ার্ক পাওয়া মাত্র সবাই
প্রত্যেকের বাসায় ফোন দিয়ে বলতে পারলাম
যে আমরা বেঁচে আছি। তাজিংডং-এর কাছে নেটওয়ার্ক
পেয়ে যে কি আনন্দ হয়েছিল
তা বলে বোঝানো যাবে না। আজ আমরা থানচির পথে হাঁটছি। শেরকর
পাড়া থেকে রওনা হয়ে দু-দুটো খাড়া পাহাড় বেয়ে কয়েক ঘণ্টার
আমানুষিক পরিশ্রম শেষে আমরা বোর্ডিং পাড়ায় এসে পৌঁছালাম।
বোর্ডিং পাড়ায় এসে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম
না। কেন জানেন? আমরা একটা দোকান পেয়েছি। তখন দুপুর
বারটা হবে।এই দোকান পাওয়ার দু-তিন ঘণ্টা আগেই আমাদের
ছ’দিনের বরাদ্দকৃত কেক-বিস্কুট শেষ হয়ে গিয়েছিল। খুব
টেনশনে ছিলাম। যাই হোক,
দোকানে বিস্কুট, কলা, চা ইত্যাদি ইত্যাদি বুভূক্ষের মত
সাবার করে দিলাম।
অবশেষে থানচি বাজার। থানচিতে এসে সাঙ্গু নদীর সুশীতল
পানিতে ঝাপিয়ে পড়লাম। সাঙ্গু নদী দেখেই খেয়াল
হলো যে গত পাঁচ-ছয়দিন গোসল করা হয়নি।
দুপুরে থানচি বাজারে জম্পেশ খেয়ে তিনটার বাসে বান্দরবান।
সন্ধ্যে নাগাদ ক্যান্টনমেন্টের ‘অনির্বাণ তিরিশ’ ক্যান্টিনে কাবাব
আর বসনিয়া পরোটা যেন অমৃত মনে হল। তারপর রাতের
বাসে ঢাকায়।
আমার ক্ষুদ্র জীবনের সেরা অভিযান ছিল সাকা হাফং মিশন।
একসাথে কেওক্রাডাং, তাজিংডং, সাকা হাফং সহ ছোট বড় অর্ধশতাধিক
পাহাড় ছয়দিন যাবৎ ট্রেকিং করা আমাদের মত ট্রেকারদের জন্য
ছিল বড় একটা চ্যালেঞ্জ। এ অভিযান
থেকে আমরা একদিকে যেমন পেয়েছি ট্রেকিং-এর আনন্দ,
তেমনি পেয়েছি সংগ্রামময় জীবনে টিকে থাকার আনন্দ, সমস্ত
প্রতিকূলতা জয় করে দেখেছি বান্দরবানের দুর্গম অঞ্চলের
চোখধাঁধানো প্রাকৃতিক রূপ, অন্যদিকে নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রাও খুব কাছ থেকে দেখেছি। একটা গান বারবারই
তখন মনে নাড়া দিয়ে যাচ্ছিল-
“এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে না কো তুমি,
সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি...”
পোস্ট টি সংগৃহীত, Sanjid Khan Mishu ভাইয়ের travelers of Bangladesh গ্রুপের একটা পোস্ট এখানে সরাসরি কপি করা।
