Posted by : Rajesh Wednesday, November 25, 2015

জাফলং, পিয়াইন নদী, খাসিয়া পুঞ্জি ও দেশের প্রথম সমতল চা বাগান ।




ওপারে খাসিয়া জৈন্তা পাহাড়, এপারে নদী। পাহাড়ের বুক চিড়ে বয়ে চলছে ঝরনা, আর নদীর বুকে স্তরে স্তরে সাজানো নানা রঙের নুড়ি পাথর। দূর থেকে তাকালে মনে হবে আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়। পাহাড়ের গায়ে নরম তুলার মতো ভেসে বেড়াচ্ছে মেঘরাশি। প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্য আর কোথায় পাবেন, জাফলং ছাড়া?

সিলেট ভিউ এর একটা পোস্ট পড়ে সিলেট ঘুরতে বের হই ১৫ নভেম্বর, ২০১৪ 

দিন ১ঃ খুলনা- ঢাকা-সায়েদাবাদ-কদমতলি(সিলেট)-শাহজালাল মাজার
দিন ২ঃ সাস্ট ক্যাম্পাস,ক্বীন ব্রিজ, আলী আমজাদের ঘড়ি ও সুরমা নদীর পাড় ।
দিন ৩ঃ কদমতলি- জাফলং জিরো পয়েন্ট-পিয়াইন নদী-খাসিয়া পুঞ্জির গ্রাম-চা বাগান-জাফলং-কদমতলি।
দিন ৩(রাত)ঃ সিলেট- ঢাকা। 
দিন ৪ঃ ঢাকা- খুলনা।

রোজ রোজ গৎবাঁধা রুটিনের বলয়ে থেকে যখন নাভিশ্বাস উঠে যায় তখনই মন চায়ছুটে যেতে পাহাড়ের ধারে, দিগন্তের কাছে, নতুন নতুন স্বর্গীয় স্থানগুলোতে পা রাখতে। 
ভোর ৫.৩০ টায় ঘুম থেকে উঠে না খেয়ে রওনা দিলাম।শীতকালে ৫.৩০ মানে অনেক ভোর, সূর্যের মুখ দেখা যায় না। উদ্দেশ্য কদমতলি বাস স্ট্যান্ড। সুরমা নদীর পাশ দিয়ে কিছুক্ষন হাঁটলাম। আমি, মানবেশ আর শোভন যখন কিন ব্রিজের কাছে আসলাম তখন প্রায় ৬ টা বাজবে। লোভ সামলাতে পারলাম না। কিন ব্রিজের উপর দিয়ে কিছুক্ষন হাঁটলাম আর স্বপ্নের সুরমা নদীকে ভালভাবে দেখলাম। এই কিন ব্রিজের সাথে অনেক ইতিহাস জড়িয়ে আছে।

ইন্টারনেটস্থ ব্লগ পড়ে কিন ব্রিজ সম্পর্কে জানতে পারছিলাম-" গত শতকের তিরিশের দশকের দিকে আসাম প্রদেশের গভর্ণর ছিলেন মাইকেল ক্বীন। তিনি তখন সিলেট সফরে এসে তার স্মৃতিকে অম্লান করে রাখতেই এ ব্রীজটি নির্মাণ করেন। ১৯৩৬ সালে ব্রীজটি আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে দেওয়া হয়। ব্রীজটির নামকরণ করা হয় গভর্ণর মাইকেল ক্বীনের নামে।১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ডিনামাইট দিয়ে ব্রীজের উত্তর পাশের একাংশ উড়িয়ে দেয়। স্বাধীনতার পর কাঠ ও বেইলী পার্টস দিয়ে বিধ্বস্ত অংশটি মেরামত করা হয়। পরবর্তীতে তা হালকা যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়।" আমরা কিন ব্রিজ দেখার পর আলী আমজাদের ঘড়িটি দেখলাম। আরআগেই বলি রাখি সিলেটের কোন রিকশাওয়ালাকে মামা ডাকবেন না, ড্রাইভার ডাকবেন। ওদের সাথে ভালভাবে কথা বললে দেখবেন আপনার যা জানা দরকার সব উত্তর পাবেন। 

হিরক আসার পর সকালে হালকা নাসতা করে বাসে উঠলাম। হিরকের সাথে আরও দুইজন ছিল। আমরা এখন ছয়জন।সিলেট নগরী থেকে ৬২ কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকে সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলায় জাফলং এর অবস্থান। সিলেট থেকে বিরতি বাসে ৬০ টাকা ভাড়া দিয়ে বসলাম বাসে। বাসে বসে মেঘালয় পাহাড় দেখতে লাগলাম। আর জাফলং যাওয়ার রাস্তাটা আপনার মন কাড়বে। কিছুটা উচুতে উঠে আবার নিচু রাস্তা, মনে হল কোন এক স্বপ্নপুরীতে আমি। আর দূর থেকে মেঘালয় পাহাড় হাতছানি দিয়ে আমাকে ডাকছে।


হয়ত, বেশি বলে ফেলছি। যাই হোক প্রথম পাহাড় দেখছিলাম তাই এত কিছু মনে পড়ছে। ১ ঘণ্টা ৫০ মিনিট পর স্বপ্নের জাফলং পৌঁছালাম। বাস থেকে নেমে ৭/৮ মিনিট হাঁটলাম। কিছু খাবার দোকান পেলাম, সেখান থেকে কিছু খাবার খেলাম এবং পানি কিনলাম। আমাদের সবথেকে বড় ভুল এখানে কোন খাবার আমরা কিনছিলাম না। কিছু খাবার কিনে নেওয়া খুব দরকার ছিল। বাজার টা পেরোনোর পর নদীর তীরে আসলাম। এটাই পিয়াইন নদী, অনেক পড়ছি এবং ইউটিউবে ভিডিও দেখছি। কিছুক্ষন পানিতে দারিয়ে থাকলাম। অনেক স্রোত আর পানি খুব ঠাণ্ডা। তবে নদীতে পানি কম ছিল, অনেকে হেটে পার হচ্ছিল।


   এখানে বেশি সময় নষ্ট না করে একটা নৌকা ভাড়া নিলাম। টুরিস্ট দেখলেই এরা বেশি টাকা চায়।  যেতে যেতে দেখলাম ডুব দিয়ে পাথর উঠানো, মাছ ধরা। ২০ মিনিট পর পৌছালাম জিরো পয়েন্ট। 

এখানে বেশি সময় নষ্ট না করে একটা নৌকা ভাড়া নিলাম। টুরিস্ট দেখলেই এরা বেশি টাকা চায়।  যেতে যেতে দেখলাম ডুব দিয়ে পাথর উঠানো, মাছ ধরা। ২০ মিনিট পর পৌছালাম জিরো পয়েন্ট। 



জাফলং-এর দর্শনীয় দিক হচ্ছে চা বাগান ও পাথর আহরণ। প্রকৃতি যেনো নিজ হাতে সাজিয়েছে জাফলং কে। ঋতুবৈচিত্র্যের সাথে জাফলংও তার রূপ বদলায়। বর্ষায় গেলে এখানে দেখা যায় ওপারের পাহাড় থেকে নেমে আসা অগনিত ঝর্ণা। সবুজের বুকে নেমে আসা ঝর্ণাধারায় সূর্যের আলোর ঝিলিক ও পাহাড়ে ভেসে বেড়ানো মেঘ । আমরা শীতের শুরু তে গেছিলাম তাই ঝর্নাটা দেখা হয়নি। আবার শীতে অন্য রূপে চারিদেকে তখন সবুজের সমারোহ, পাহাড় চূড়ায় গহীন অরণ্য। ফলে শীত এবং বর্ষা সব সময়েই বেড়ানোর জন্য উপযুক্ত। জাফলংয়ের বুক চিড়ে বয়ে গেছে দুই নদী। ধলাই ও পিয়াইন। পিয়াইন নদী অন্যন্যতা এনে দিয়েছে জাফলংকে।



পিয়াইনের স্বচ্ছ জলে দল বেঁধে ঘুরে বেড়ায় নানা জাতের ছোট মাছ, যা আমাকে পানিতে নামতে আগ্রহী করে তুলছিল। সীমান্তের ওপারে দুই পাহাড়ের মধ্যখানে ঝুলন্ত সেতু বাড়িয়ে তুলেছে জাফলংয়ের সৌন্দর্য। পাহাড়, ঠাণ্ডা পানি, পান, পাথর, ঝর্ণা সবমিলিয়ে জাফলং যেনো এক রূপকথার রাজ্য। সীমান্তের ওপারে ইনডিয়ান পাহাড় টিলা, ডাউকি পাহাড় থেকে অবিরামধারায় প্রবাহমান জলপ্রপাত, ঝুলন্ত ডাউকি ব্রীজ, পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ হিমেলপানি,উঁচু পাহাড়ে গহিন অরণ্য ও শুনশান নিরবতার কারণে এলাকাটি পর্যটকদেরদারুণভাবে মোহাবিষ্ট করে। পাহাড় আর নদীতে সীমাবদ্ধ নয় জাফলংয়ের সৌন্দর্য্য। 

যাওয়ার কিছুক্ষণ পর নেমে পড়ি এই নদীতে।ছোটবেলা থেকে ঘোলা আর লোনা পানিতে সাতার কাটছি আর স্বচ্ছ আর ঠাণ্ডা পানিতে সুযোগ টা পেয়ে হাতছাড়া করব না। আমার নামার পর একএক করে সবাই নামল। শুধু আমি একা না আমার মত আরও অনেকে পাগলের মত সাতার কাটছিল। কেউ ছবি তুলছে, কেউ পাথর উঠাচ্ছে, যে যার কাজ করছে। তবে একটা কথা না বললেই নয়, কেউ আবার বেশি সাহস দেখাতে যেয়ে পাথরের উপর দিয়ে খুব জোরে হাটতে যাবেন না। পাথরগুলো অনেক পিচ্ছিল। না পারছিলাম ঠিকমত হাটতে না পারছিলাম ঠিকমত ভেসে বেড়াতে। প্রায় দেড় ঘণ্টা সাতার কাটা, ডুব দিয়ে পানির নিচ থেকে পাথর উঠানো।পিয়াইন নদীর তীরে স্তরে স্তরে বিছানো পাথরের স্তূপ জাফলংকে করেছে আকর্ষণীয়। দুই নদীর পানির নিচ থেকে ডুব দিয়ে হাজার হাজার শ্রমিকের পাথর উত্তোলনের দৃশ্যও আসলেই দেখার মত। নদীর পানিতে নারী-পুরুষের এই ‘ডুবোখেলা’ দেখা যায় ভোর থেকে সন্ধ্যা অবধি। একানে কিছু দোকান পাবেন যেগুলোতে ভারতীও জিনিস পাবেন ইচ্ছা হলে প্রিয়জনের জন্য কিছু কিনতেও পারেন।

Leave a Reply

Subscribe to Posts | Subscribe to Comments

- Copyright © Travel With Me - Skyblue - Powered by Blogger - Designed by Johanes Djogan -