- Back to Home »
- করমজল, সুন্দরবন
Posted by : Rajesh
Tuesday, November 24, 2015
পৃথিবীর যা কিছু সুন্দর সবই মানুষের জন্য সৃষ্টি। সৃষ্টি সুন্দরের অন্বেষনে মানুষ খুঁজে ফিরে এধার থেকে ওধার। আর এই সুন্দর স্থানের নামই যদি হয় সুন্দরবন তাহলে আর নতুন করে বলার প্রয়োজন থাকে না কতটা সুন্দর ঐ বনটি। আর ছোটবেলা থেকে বেড়ে উঠা যদি হয় এই বনটি থেকে মাত্র ২১ কিলোমিটার দূরে তাহলে মনের মাঝে অনেক আগেই বনটি দেখার বাসনা জাগবেই। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে চলা দৈনন্দিন জীবন যখন পায় না ভ্রমনের সামান্য সুযোগ তখন সুন্দরটা বড় অসুন্দর হয়ে মনের দুয়ার দিয়ে পালিয়ে রক্ষা পায়। তবুও আশায় বাঁধি বুক, একদিন ঠিকই সুন্দরের পুজা দিতে দৃষ্টি নিক্ষেপ করবো সুন্দরবনে।
তুলনামুলক কম বয়স এবং কটকা বা দুবলার চর বা হিরন পয়েন্ট দু'চোখ মেলে দেখার অনুমতি না থাকায় আগ্রহ থাকার সত্তেও করমজল দেখে সন্তুষ্ট থাকলাম। যদিও তখন এটা ছিল আমার নিকটে স্বপ্নের সুন্দরবন।
গত ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারীতে আমার ইচ্ছার কাছে সময়কে হার মানিয়ে ১৪/১৫ জন কলেজ ফ্রেন্ডদের সাথে যাত্রা শুরু করি সুন্দরবনের করমজলের উদ্দেশ্যে। সকাল ৮টায় আমি মংলা পৌছালেও কয়েকজন ফ্রেন্ডের দেরিতে পেটভোজন শেষ করলাম। সবাই এলে দুপুরের খাওয়ার জন্য নেওয়া হলো হালকা খাবার আর পানীয় জল। ৪৫০ টাকায় নৌকা ভাড়া করা হল। বিভিন্ন রংয়ের কারুকাজে সাজানো একটি ইঞ্জিন চালিত পানসী নৌকা। মাঝি হারুন কাকা আগে থেকে পরিচিত থাকায় আমরা যেতেই আমাদের সাদরে গ্রহন করে নিলেন। শর্ত বিকাল ৫টা পর্যন্ত যতক্ষন ইচ্ছা সময় কাঁটাতে পারবো সুন্দরবনের করমজলের হরিন ও কুমির প্রজনন কেন্দ্র এলাকায়। তারুণ্যের উদ্ভাসে টগবগ করছিলাম যেন আমরা।
যেতে যেতে জাহাজ দেখা।
|
ফ্রেন্ডদের সাথে বাধভাঙা আনন্দ করতে করতে অজস্র ঢেউ ভেঙ্গে বাসযোগ্য এলাকাকে পিছনে ফেলে গহীন পানিতে নোঙ্গর করা বড় বড় জাহাজ দেখতে দেখতে প্রায় দেড় ঘণ্টা পর পৌছে গেলাম নয়নাভিরাম দৃষ্টিনন্দন করমজল।
প্রবেশ পথ।
|
নৌকা নোঙ্গর করার জন্য কাঠ দিয়ে তৈরী দারুন সব ঘাটে রং বেরংয়ের নৌকা আর চোখ জুড়ানো সবুজ গাছের সমারোহ চোখের সামনে এঁকে দিলো নতুন এক পৃথিবী। খুব একটা বড় না হলেও অনেকটা জায়গা নিয়ে এই সংরক্ষিত বন এলাকা ।
মানচিত্র।
|
প্রবেশপথেই মাটিতে শোয়ানো বিশালাকৃতির মানচিত্র সুন্দরবন সম্পর্কে সাম্যক ধারণা দেবে। মানচিত্রটিকে পেছনে ফেলে বনের মধ্যে দক্ষিণে চলে গেছে আঁকাবাঁকা কাঠের তৈরি হাঁটা পথ। এই নাম ‘মাঙ্কি ট্রেইল’।
মাঙ্কি ট্রেইল।
|
এই নামের স্বার্থকতা খুঁজে পাওয়া যায় ট্রেইলে পা ফেলার সঙ্গে সঙ্গেই। পুরো ট্রেইল জুড়েই দেখা মিলবে সুন্দরবনের অন্যতম বাসিন্দা রেসাস বানরের। বানরগুলো ট্যুরিস্টদের কাছাকাছি চলে আসে। হাতে কলা বা অন্য কোনো খাবার নিয়ে পথ না চলাই ভালো। কারণ বানরগুলো খাবারের জন্য আপনাকে ঘিরে ধরতে পারে। তাই সাবধান বানর থেকে।
রেসাস বানর।
|
কাঠ বিছানো পথের দুই ধারে ঘন জঙ্গল। দুই পাশে বাইন, কেওড়া আর সুন্দরী গাছের সারি। তবে বাইন গাছের সংখ্যা বেশি। কাঠের পথটি কিছু দূর যাওয়ার পর হাতের বাঁয়ে শাখা পথ গিয়ে থেমেছে পশুরের তীরে। শেষ মাথায় নদীর তীরে বেঞ্চ পাতানো ছাউনি। মূল পথটি আরও প্রায় আধা কিলোমিটার দক্ষিণে গিয়ে ছোট খালের পাড়ে থেমেছে।এরপর পায়ে চলা আঁকা-বাঁকা মেঠো পথ। পথের দু'পার্শ্বে বড় বড় গাছে বানরের লাফা-লাফি আর ভেংচি কাটা উপভোগ করতে করতে অনেকটা পথ বনের গহীনে চলে এসেছি।
বনের মাঝে আমরা ক'জন।
|
এ পথের মাথায় গোলপাতার ছাউনির গোলাকৃতির আরও একটি শেইড। যেখানে বেঞ্চে বসে বনের নিস্তব্ধতা উপভোগ করা যাবে। সেখান থেকে আবারও পশ্চিম দিকে কাঠের ট্রেইলটি চলে গেছে কুমির প্রজনন কেন্দ্রের পাশে। এই ট্রেইলের মাঝামাঝি জায়গায় নির্মাণ করা হয়েছে একটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার (বুরুজ)। করমজলে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হচ্ছে একটি সুউচ্চ ওয়াচ টাওয়ার। এর চূড়ায় থেকে করমজল এবং চারপাশটা ভালো করে দেখা যায়। সুন্দরবনের উপরিভাগের সবুজাভ নয়নাভিরাম এ দৃশ্য দেখে যে কেউ মুগ্ধ হতে বাধ্য।
ওয়াস টাওয়ার থেকে দেখা করমজল।
|
কাঠের তৈরি ট্রেইলের একেবারে শেষ প্রান্তে কুমির প্রজনন কেন্দ্র। সেখান থেকে সামান্য পশ্চিম দিকে হরিণ ও কুমিরের প্রজনন কেন্দ্র। সামনেই ছোট ছোট অনেকগুলো চৌবাচ্চা। কোনটিতে ডিম ফুটে বের হওয়া কুমির ছানা, কোনটিতে মাঝারি আকৃতির আবার কোনটিতে আরও একটু বড় বয়সের লোনা জলের কুমিরের বাচ্চা।
কুমিরের বাচ্চা।
|
একেবারে দক্ষিণ পাশে দেয়াল ঘেরা বড় পুকুরে আছে রোমিও, জুলিয়েট আর পিলপিল। লবণ পানির প্রজাতির কুমিরের প্রজনন বৃদ্ধি ও লালন-পালনের জন্য সুন্দরবনস বায়োডাইভার্সিটি কনজারভেশন প্রকল্পের আওতায় ২০০২ সালে পূর্ব সুন্দরবনের করমজল পর্যটন কেন্দ্রে ৮ একর জমির ওপর বনবিভাগের উদ্যোগে গড়ে তোলা হয় দেশের একমাত্র সরকারি এই কুমির প্রজনন কেন্দ্র। ওই বছর সুন্দরবনের বিভিন্ন নদীতে জেলেদের জালে আটকা পড়া ছোট-বড় পাঁচটি লোনা পানির কুমির নিয়ে কেন্দ্রের কার্যক্রম শুরু হয়। রোমিও-জুলিয়েটের বয়স এখন ২৪। এই জুটি প্রজননক্ষম হয় ২০০৫ সালে।জুলিয়েট আকারে রোমিওর চেয়ে সামান্য ছোট। লোনা পানির এই প্রজাতির কুমির ৮০ থেকে ১০০ বছর বাঁচে।
রোমিও/জুলিয়েট।
|
এর পাশেই চোখে পড়বে চিড়িয়াখানার মতো উপরিভাগ উন্মুক্ত খাচায় ঘেরা খোলা জায়গা। ভেতরে চিত্রা হরিণ। খাঁচার ভেতরে পশ্চিম কোণে ছোট আরেকটি খাঁচা। ভেতরে রয়েছে কয়েকটি রেসাস বানর।এর পাশেই চোখে পড়বে চিড়িয়াখানার মতো উপরিভাগ উন্মুক্ত খাচায় ঘেরা খোলা জায়গা। ভেতরে চিত্রা হরিণ। খাঁচার ভেতরে পশ্চিম কোণে ছোট আরেকটি খাঁচা। ভেতরে রয়েছে কয়েকটি রেসাস বানর।
চিত্রা হরিন।
|
হরিন কে খাবার দেওয়ার সময়।
|
সাথে থাকা খাদ্য আর পানীয় জল সুযোগ মত সদব্যবহার হচ্ছিল নিয়মিত তাই পেটে ছিলনা ক্ষুদার তাড়না। ফিরে যাওয়ার কথা প্রায় বেমালুম ভুলতে বসেছিলাম। এবার যাবার পালা। সবাই মিলে আবার নৌকাতে করে মংলা ফিরে যে যার মত বাড়িতে।










