Posted by : Rajesh Wednesday, November 25, 2015

সমগ্র ক্রিকেট বিশ্বকে হতভম্ব করে দিয়ে ক্রিকেট মাঠে বলের আঘাত নিয়ে হাসপাতালে যাওয়া অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটার ফিলিপ হিউজ গতকাল শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। মাত্র ২৫ বছর বয়সে পরপারে চলে যাওয়া এই তরুণকে নিয়ে বিশেষ আয়োজন—

‘পিচ্চি’টা আর নেই!

ফিলিপ হিউজ

১৯৮৮-২০১৪

“সবচেয়ে যে শেষে এসেছিল

সেই গিয়েছে সবার আগে সরে।

ছোট্ট যে জন ছিল রে সবারচেয়ে

সেই দিয়েছে সকল শূন্য করে।”

—ছিন্নমুকুল; সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত

 

চোখমুখে একটা দারুণ আদুরে ব্যাপার ছিল। দলে সবার ছোট ছিলেন বলে সতীর্থরা একেবারে ছোট ভাইটার মতোই ভালো বাসতেন। ডেভিড ওয়ার্নার তো আদর করে ‘লিটল মেট’ বলেই ডাকতেন। আর সেই ছোটবেলা থেকে ক্রিকেট মহলে একনামে লোকজন তাকে ডাকত—দ্য কিড; পিচ্চি।

নিয়তির কী নিষ্ঠুরতা, সেই আদরের দুলাল, অস্ট্রেলিয়ার প্রতিশ্রুতিশীল টেস্ট ক্রিকেটার, ‘পিচ্চি’ ফিলিপ জোয়েল হিউজ চলেই গেলেন; চলেই গেলে ব্যাট-বলের এই তুচ্ছ পৃথিবীর বাঁধন কাটিয়ে। ২৬তম জন্মদিনের ঠিক চার দিন আগে ‘বিদায়’ বলে দিলেন নশ্বর দুনিয়াকে।

মঙ্গলবার শেফিল্ড শিল্ডের ম্যাচে শন অ্যাবটের বলে মাথায় আঘাত পাওয়ার পর দুই দিন ধরে লড়াই করেছেন সিডনির সেন্ট ভিনসেন্ট হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে; কিন্তু আর পারলেন না হিউজ। সেই আঘাতের পর আর একটি বারের জন্যও জ্ঞান ফিরে না আসা এই তরুণ ক্রিকেটার মাত্র ২৫ বছর বয়সে পরলোকে পাড়ি জমালেন গতকাল।

পুরো ক্রিকেট বিশ্বকে শোকবিমূঢ় করে দেয়া এই প্রয়াণের খবর নিশ্চিত করে সংবাদ সম্মেলনে কান্নায় ভেঙে পড়েন ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার টিম চিকিত্সক পিটার বার্কনার, ‘খুবই দুঃখজনক একটা দায়িত্ব হিসেবে আমি সবাইকে জানাচ্ছি যে, অল্প কিছুক্ষণ আগে আমাদের ছেড়ে চলে গেছে ফিলিপ হিউজ। আঘাত পাওয়ার পর থেকে তার আর কখনোই জ্ঞান ফিরে আসেনি। আমরা নিশ্চিত করছি, মৃত্যুকালে কোনো যন্ত্রণা ভোগ করেনি ফিলিপ। বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের বেষ্টিত অবস্থায়ই সে আমাদের ছেড়ে গেছে।’

তা সত্যি। মাইকেল ক্লার্ক সেই শুরুর দিন থেকে শেষ অবদি একটা মুহূর্তের জন্য হাসপাতাল ছেড়ে যাননি। ব্র্যাড হাডিন, স্টিভেন স্মিথ, শেন ওয়াটসন, ডেভিন ওয়ার্নার, নাথান লিওন, মিশেল স্টার্করা এই কটা দিন হাসপাতালেই যাতায়াতের মধ্যে ছিলেন। রিকি পন্টিং, স্টিভ ওয়াহ, সাইমন ক্যাটিচ, অ্যারন ফিঞ্চ, পিটার সিডল, জর্জ বেইলি, জাস্টিন ল্যাঙ্গার থেকে শুরু করে জাতীয় দলের কোচ ড্যারেন লেহম্যান বা ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার প্রধান নির্বাহী জেমস সাদারল্যান্ড ছিলেন হিউজের শেষ সময়টাতে।

না থেকে উপায় কী!

ফিলিপ হিউজ শুধু অস্ট্রেলিয়ার একজন উঠতি তারকাই ছিলেন না, ছিলেন সারা ক্রিকেট বিশ্বেরই এক সম্ভাবনাময় তারকা; মহাতারকা হয়ে ওঠারও সম্ভাবনা ছিল যার।

১৯৮৮ সালের ৩০ নভেম্বর নিউসাউথ ওয়েলসের ম্যাকসভিলে শহরে বাবা গ্রেগ ও মা ভার্জিনিয়া হিউজের ঘরে জন্মেছিলেন এই ভবিষ্যত্ অস্ট্রেলীয় তারকা। বাবার কলার খামারে বেড়ে উঠেছেন তিনি। সেখানেই বন্ধুদের সঙ্গে ক্রিকেট শুরু। একটু বড় হতেই হিউজকে গড়ে পিটে বড় করে তোলার দায়িত্ব নেন মাইকেল ক্লার্কের কোচ ডি কস্তা। এই ভদ্রলোকই মূলত হিউজকে ‘দ্য কিড’ বলে পরিচয় করিয়ে দেন।

২০০৯ সালে মাত্র ২১ বছর বয়সে টেস্ট অভিষেক হয়ে যায় দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে। ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় টেস্টেই অস্ট্রেলিয়ার হয়ে সর্বকনিষ্ঠ ব্যাটসম্যান হিসেবে সেঞ্চুরি করে বুঝিয়ে দেন- তিনি থাকতে এসেছেন। এরপর ক্যারিয়ারে কিছু উত্থান-পতন পার হতে হয়েছে হিউজকে। ২০১৩ সালে হয়েছে ওয়ানডে অভিষেক; একমাত্র অস্ট্রেলিয়ান হিসেবে এই ফরম্যাটে অভিষেকেই সেঞ্চুরি করেছেন।

এবার বলা হচ্ছিল, ফিলিপ হিউজ নিজেকে স্থায়ী করতেই মাইকেল ক্লার্কের বদলে দলে আসছেন। আগমনী গানটা ওই সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডেই শোনাচ্ছিলেন। একের পর এক বাউন্সার সামলে, বল সীমানা ছাড়া করে ফিফটি পার করে গেলেন। ৬৩ রানে ব্যাট করতে থাকা হিউজ আরেকটা সেঞ্চুরির স্বপ্ন আটছিলেন হয়তো।

কিন্তু অ্যাবটের এবারের বাউন্সারটা কি ভেবে যেন পুল করতে গেলেন। ঘাড়ে বল লাগল, হেলমেট খুলে ফেললেন, পড়ে গেলেন সামনে মুখ করে; তারপর সব শেষ। সব স্বপ্ন, সব লক্ষ্য, সব গল্প থেমে গেল।

আসলেই কী হিউজের গল্প এখানে থেমে গেল? তাই কী হয়! ক্রিকেটের এই ‘পিচ্চি’ কী থেমে যেতে পারেন! ফিলিপ হিউজ থাকবেন না, থাকবেন তার বন্ধুরা। তার হয়ে ব্যাট করবেন, সেঞ্চুরি করবেন এবং অদৃশ্য এক কালিতে লেখা হবে—ফিলিপ হিউজ নট আউট। 

----

আসলে কী হয়েছিল?

g   স্পোর্টস ডেস্ক

পৃথিবী জুড়ে এখন দুই ধরনের আতঙ্ক কাজ করছে। প্রথমত ব্যাটসম্যানরা নতুন করে দারুণ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এবং দ্বিতীয়ত ফাস্ট বোলাররা ভয় পাচ্ছেন—বাউন্সার কী আর আদৌ দেওয়া ঠিক হবে!

ব্যাটসম্যান ও বোলারদের এই আতঙ্ক ও সংশয় দূর করতে এগিয়ে এসেছেন ফিলিপ হিউজের চিকিত্সক দল এবং এই ধরনের ইনজুরি বিশেষজ্ঞ। তারা বলছেন, এতে কারো ভয় পাওয়ার কিছু নেই। নির্দ্বিধায় বাউন্সার দেওয়া ও খেলা যেতে পারে। কারণ, এটি খুবই অস্বাভাবিক ও ভুতুড়ে একটা ইনজুরি। যা ক্রিকেটের শত বছরের ইতিহাসে খুব একটা দেখা যায়নি। ফলে এমনটা রোজ ঘটবে, ভাবার কোনো কারণ নেই।

ফিলিপ হিউজের সুরক্ষা ব্যবস্থায় কোনো দুর্বলতা ছিল না। নিয়ম অনুযায়ী অন্যান্য গার্ডের সঙ্গে হেলমেটও পরা ছিলেন তিনি। এই ইনিংসে খুবই দক্ষতার সঙ্গে বাউন্সার ছেড়েছেনও এর আগে এবং হুকও করেছেন। কিন্তু এই বলটায় হুক করতে গিয়ে টাইমিং না হওয়াতে বলটা এসে লাগে মূলত কানের সামান্য নিচে ঘাড়ের এক পাশের দিকে। ফলে মস্তিষ্কে রক্ত পৌঁছানোর বৃহত্তম ধমনীটি সঙ্গে সঙ্গে চাপা পড়ে যায় বলে বলেছেন ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার চিকিত্সক পিটার বার্কার।

বার্কার ব্যাখ্যা করে বলেছেন, এই ধমনীতে কার্যত সঙ্গে সঙ্গে ছিঁড়ে যাওয়ায় মস্তিষ্কে বিপুল রক্তক্ষরণ ও রক্ত জমা হতে থাকে; যা অনেক সময় তাত্ক্ষণিক মৃত্যু ঘটায়। তবে নিউসাউথ ওয়েলসের চিকিত্সক ডক্টর জন অর্চার্ড বলেছেন, খুব দ্রুত অসাধারণ ভাবে হিউজকে উদ্ধার করায় তাকে চিকিত্সা দেওয়া পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখা গেছে।

এমনকি সেন্ট ভিনসেন্ট হাসপাতালের ট্রমা বিভাগের প্রধান ডক্টর টনি গ্রাবসও স্বীকার করেছেন, হিউজকে খুব দ্রুতই চিকিত্সার অধীনে আনা হয়েছে। এ ধরনের ইনজুরিতে আসলে চিকিত্সা পর্যন্ত বেশিরভাগ রোগীকে পৌঁছানো যায় না বলেই তারা বলছেন। তিন চিকিত্সকই বলেছেন, আসলেই এ ধরনের ইনজুরি রোজ রোজ ঘটে না। ফলে এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার খুব একটা কারণ নেই।

এমনকি সতীর্থ ক্রিকেটারদের উদ্দেশে চিকিত্সকরা নিশ্চিত করেই বলেছেন, এমন ঘটনার রেকর্ড ইতিহাস খুঁজলে একশটাও পাওয়া যাবে না।

দুই মিনিট নীরবতা পালন করবে শ্রীলঙ্কা

অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যান ফিলিপ হিউজের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আগামীকাল (শনিবার) কলম্বোতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অনুষ্ঠিতব্য দ্বিতীয় ওয়ানডে ম্যাচ শুরুর আগে দুই মিনিট নীরবতা পালন করবেন শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটাররা।

শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট (এসএলসি) জানিয়েছে, অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যানের মৃত্যুতে শোক হিসেবে শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটাররা কালো ব্যাজও ধারণ করবেন। তবে প্রমাদাসা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিতব্য দ্বিতীয় ম্যাচে খেলোয়াড়দের এ কর্মসূচি নির্ভর করছে ম্যাচ কর্মকর্তাদের অনুমোদনের উপর। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এসএলসির এক কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা এএফপি’কে জানান, ‘আমরা ম্যাচ কর্মকর্তাদের আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের অপেক্ষায় আছি।’ অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া ক্রিকেটে একটি শর্ট পিচ বলে মঙ্গলবার মাথায় আঘাত পেয়ে বৃহস্পতিবার সিডনির একটি হাসপাতালে মারা যান ২৫ বছর বয়সী হিউজ। শ্রীলঙ্কা দলের এমন কর্মসূচির বিষয়ে কলম্বোতে অবস্থানকারী ইংল্যান্ড দলের তাত্ক্ষণিক কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি। শ্রীলঙ্কান কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হিউজের প্রতি যৌথভাবে সম্মান জানানোর বিষয়ে দুই দলের মধ্যে আলোচনা চলছে। 

দেয়া বিবৃতিতে এসএলসি সেক্রেটারি নিশান্থা রানাতুঙ্গা বলেন, ‘ফিল হিউজের এই মর্মান্তিক মৃত্যুতে আমরা অত্যন্ত শোকাহত এবং আমরা তার পরিবার, বন্ধু, সতীর্থ খেলোয়াড় ও আমাদের বন্ধু ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি।’


যে ছিলেন হিউজ

n পুরো নাম: ফিলিপ জোয়েল হিউজ

n ডাক নাম: হাগসি, দ্য কিড

n জন্ম: ৩০ নভেম্বর, ১৯৮৮; নিউ সাউথ ওয়েলস

n মৃত্যু: ২৭ নভেম্বর, ২০১৭; নিউ সাউথ ওয়েলস

n উচ্চতা:

n ব্যাটিং: বাঁহাতি ব্যাটসম্যান

n বোলিং: ডানহাতি অফস্পিনার

n দল: অস্ট্রেলিয়া, নিউ সাউথ ওয়েলস, মিডলসেক্স, হ্যাম্পশায়ার, সিডনি থান্ডার, উরচেস্টারশায়ার, সাউথ অস্ট্রেলিয়া, অ্যাডিলেড স্ট্রাইকার্স, মুম্বাই ইন্ডিয়ানস

n টেস্ট অভিষেক: ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০০৯; বনাম দক্ষিণ আফ্রিকা

n শেষ টেস্ট: ১৮ জুলাই, ২০১৩; বনাম ইংল্যান্ড

n ওয়ানডে অভিষেক: ১১ জানুয়ারি, ২০১৩; বনাম শ্রীলঙ্কা

n শেষ ওয়ানডে: ২২ অক্টোবর, ২০১৪; বনাম পাকিস্তান

n জার্সি নম্বর: ৬৪

আর্ন্তজাতিক ক্যারিয়ার

                             ম্যাচ       রান           গড়               সর্বোচ্চ        ১০০/৫০

টেস্ট                      ২৬         ১৫৩৫      ৩২.৬৫         ১৬০           ৩/৭

ওয়ানডে               ২৫         ৮২৬        ৩৫.৯১         ১৩৮*         ২/৪

টি-টোয়েন্টি          ১            ৬              ৬.০০           ৬                ০/০     ­

Leave a Reply

Subscribe to Posts | Subscribe to Comments

- Copyright © Travel With Me - Skyblue - Powered by Blogger - Designed by Johanes Djogan -